ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়ার রাজনীতিতে ঘটতে পারে নয়া মেরুকরণ। ৫ আগষ্ট ছাত্র জনতার গনঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগের পর পটিয়ার আ: লীগের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা চলে গেছে জনরোষের ভয়ে আত্নগোপনে। সে সমীকরণের হিসেব কষলেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিবে কি নিবে না তা ফিফটি ফিফটি। সে হিসেবে দীর্ঘ দেড় দশকের শূন্য স্থান ফিরে পাওয়া নিয়ে উঠেছে নানা জল্পনা কল্পনা। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিগত সতের বছরে যারা আন্দোলন সংগ্রাম, হামলা মামলা, জেল জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়ে পটিয়ায় বিএনপিকে জাগরূক রেখেছেন। বিপরীতে আর যারা বিগত বছরগুলোতে বিএনপি নেতাকর্মীদের খবর না রাখা, কোন মামলার আসামি পর্যন্ত না হওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে তাদের সাথে সখ্যতা রেখে চলা সুবিধাবাদী বিএনপি নেতারা। এ সমীকরণে বর্তমানে পটিয়ার বিএনপির রাজনীতি ৫ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে এনামুল হক এনাম গ্রুপ, গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান জুয়েল গ্রুপ, ইদ্রিচ মিয়া গ্রুপ, গাজী সিরাজ উল্লাহ গ্রুপ ও রেজাউল করিম নেছার গ্রুপ। সেই সুযোগে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপি। ইতোমধ্যে এলডিপির চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সভাপতি এম এয়াকুব আলীর নেতৃত্বে পটিয়ায় এলডিপির রাজনীতির প্রচার ও প্রসার হতে চলছে। ৫ আগষ্ট গনঅভ্যুত্থানের পর থেকেই কোমর বেঁধে মাঠে নেমে চষে বেড়াচ্ছে এ রাজনীতিবিদ। তিনি শুধু পটিয়ায় নন দক্ষিণ চট্টগ্রামের আটটি উপজেলায়ও এলডিপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।
এদিকে, গত ১৯ জানুয়ারি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৮৯ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আগামী নির্বাচন বিএনপির জন্য সহজ নয়, ভুল করলে পস্তাতে হবে। সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের জনগণের পাশে থাকতে হবে। গত কয়েক মাস থেকে বলছি সামনের নির্বাচন যত সহজ ভাবছেন, তত সহজ নয়। আপনারা মনে মনে যতই বড়াই করুন, আরে বিএনপির তো শাখা-প্রশাখা গ্রাম পর্যন্ত আছে, অন্যদের কি আছে? কিন্তু তারপরও জনগণ ম্যাটারস (আসল শক্তি)। কারণ জনগণ হচ্ছে আমাদের সমর্থন, জনগণ হচ্ছে আমাদের শক্তি। জনগণ সঙ্গে না থাকলে কী হয়, সেটা ৫ আগস্ট বুঝিয়ে দিয়েছে। কাজেই আমরা যদি ভুল করি, জনগণ আবার একটা বুঝিয়ে দেবে। তখন কিন্তু আমাদের পস্তাতে হবে, তখন কিন্তু হা-হুতাশ করতে হবে।
এ সময় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, এখনো সময় আছেৃআসুন, আসুন, আসুন, আমরা জনগণের পাশে থাকি, জনগণের সঙ্গে থাকি।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে উল্লেখ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, কেউ যদি এমন কিছু করে যা আপনাকে আমাকে দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, আমরা তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলব। আমরা কে ছোট নেতা, কে গ্রামের নেতা, কে ইউনিয়নের নেতা, কে বড় নেতা, কে বিভাগীয় নেতা, কে কেন্দ্রীয় নেতা বিষয়টা এমন নয়। বিষয়টি হচ্ছে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হবে। রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে আমাদের একটি শপথ হোক জনগণ যেন বুঝে জনগণ যেভাবে চায়, আমরা সেভাবেই তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পাশে আছি।
অপরদিকে, অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও একসঙ্গে পথ চলতে ঐকমত্যে পোষণ করেছে বিএনপি এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। গত ২৭ ডিসেম্বর রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এলডিপির সঙ্গে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে দল দুথটির নেতারা এই ঐকমত্যে পৌঁছান। বৈঠকে বিএনপির পক্ষে অংশ নেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
বৈঠকে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রুখতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে বলে ঐক্যমত পোষণ করেন বিএনপি-এলডিপি। এজন্য বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি নিয়ে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় যাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। এ ছাড়া বৈঠকে দ্রুততম সময়ে নির্বাচন দেওয়ার বিষয়েও নেতারা আলোচনা করেন।
বৈঠকে শেষে নজরুল ইসলাম খান বলেন, দেশের চলমান পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সচিবালয়ে আগুন ও দ্রবমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা একমত পোষণ করেছি। জনগণ দুঃসময়ের একটা কাল অতিক্রম করেছে। দীর্ঘদিন লড়াই-সংগ্রামের মধ্যে ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে। আমাদের লড়াই ছিল গণতন্ত্র ও তাদের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার। সাম্য ও মানবিক মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত হয়। সেটা প্রতিষ্ঠার জন্য দ্রুত দরকার জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার। আমরা আশা করি, যত দ্রুত সম্ভব জনগণের ক্ষমতা তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।
এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ বলেন, স্বৈরাচার পতনের পর দেশের রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনে বিএনপির পক্ষ যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নে আমরা সর্মথন দিয়ে পাশে থাকব।
অপরদিকে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পটিয়ায় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি অংশ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের ৫ মাসের কর্মকাণ্ড ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার দলটিকে সমালোচনার জায়গায় নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দলের শীর্ষপর্যায় থেকে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হলেও কার্যত কোনো সুফল মেলেনি। বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশনা অমান্য করে সারা দেশে বিশৃঙ্খলা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন তৃণমূলের বহু নেতাকর্মী। যদিও এসব বিষয়ে খুবই কঠোর অবস্থানে থাকতে দেখা যাচ্ছে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের। যখনই কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা গেছে। এখন পর্যন্ত দলের নেতাকর্মীদের অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে বিএনপিতে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা কোনো ধরনের অনিয়ম অপরাধ ও দখলদারির সঙ্গে জড়িত থাকলে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যত বড় নেতাই হোক, অপকর্মে লিপ্ত হলে কাউকে ছাড় দেবে না বিএনপি। অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রথমে তাকে শোকজ করা হচ্ছে। তারপর পদ স্থগিত কিংবা বহিষ্কারের ঘটনা আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন। বিএনপির জিরো টলারেন্স নীতিতে আছে অপরাধের বিষয়ে। যারা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কোনো রকমের দখল কিংবা অপরাধে জড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএনপি।
সূত্রে জানা যায়, বিএনপির সাথে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপি আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচন করবে। সে হিসেবে ড. অলি আহমদের দলটি বিএনপির কাছে সারাদেশে ১০-১২টি আসন চাইবে। তাদের মধ্যে শতভাগ নিশ্চিত চন্দনাইশের চট্টগ্রাম-১৩ সংসদীয় আসনটি। এছাড়াও যদি পটিয়া আসনে বিএনপির একাধিক গ্রুপিং বা রেষারেষির যাঁতাকলে পড়েন তাহলে এ আসন ভাগ বসাবে এলডিপি। তাহলে শতভাগ নিশ্চিত প্রার্থী হবেন এলডিপির জেলা সভাপতি ও এয়াকুব গ্রুপের চেয়ারম্যান শিল্পপতি এম এয়াকুব আলী।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এলডিপির সভাপতি শিল্পপতি এম এয়াকুব আলী বলেন, আমি ২০০৮ সালে মহাজোট থেকে পটিয়া সংসদীয় আসনে মনোনয়ন পেয়েছিলাম। কিন্তু ১/১১ এর কারনে সেই নির্বাচন আর হয়নি। এলডিপির রাজনীতির শুরু থেকেই আমি জড়িয়ে আছি আজ অবধি। আমার প্রতি বিশ্বাস করে দলের প্রেসিডেন্ট খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম দক্ষিণ জেলার গুরু দায়িত্ব দিয়েছেন। জেলার দায়িত্ব পেয়ে আমি একদিনও বসে থাকিনি। আমি দক্ষিণ জেলার প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ছুটে চলছি। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে আমি তৃনমুল পর্যায়ের এলডিপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে সন্মেলনের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে প্রাণপন চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
অন্যদিকে, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। যদিও আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোতে বইছে নির্বাচনী হওয়া। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ অধিকাংশ দল এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী জোট করে ভোট করলেও আগামী নির্বাচনে এককভাবে লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছেন দুই দলের নেতারাই। ইতোমধ্যে জামায়াত ইসলামী ১৬ টি সংসদীয় আসনে ১৬ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। জামায়াতের প্রার্থী পটিয়া থেকে ডা. ফরিদুল আলম। এখানেই শেষ নয়, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় আসা কিংবা আসন ভাগাভাগি করে বিরোধী দল হওয়া জাতীয় পার্টিও চায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এককভাবে সারা দেশে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে। সে হিসেবে পটিয়া থেকে প্রার্থী হবেন দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টির আহবায়ক নুরুচ্ছফা সরকার।
অতিসম্প্রতি নিবন্ধন পাওয়া গণ অধিকার পরিষদ থেকে পটিয়ায় প্রার্থী হতে পারেন সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এমদাদুল হাসান, আমার বাংলাদেশ পার্টিও (এবি পার্টি) ৩০০ আসনে প্রার্থীর সন্ধান করছে।
গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর বলেন, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। তরুণ নেতৃত্ব দেখতে চায়। তরুণ প্রজন্মই পারে মানুষকে নতুন কিছু দিতে। আর আমরাই সেটা পারব বলে বিশ্বাস করি। যখন নির্বাচন হবে আমরা ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেব। মানুষ যে পরিবর্তন চাইছে, আমরাই হব সে পরিবর্তনের একমাত্র ভরসা।




