ভেভিল হান্টেও ধরাছোঁয়ার বাইরে চট্টগ্রামের আ: লীগের নীতিনির্ধারকেরা

কাউছার আলম:

চট্টগ্রামের পটিয়ায় স্বৈরাচারি শেখ হাসিনার চিহ্নিত ও সুবিধাভোগী দোসরদের কাউকেই এখনো গ্রেফতার গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লবে গণহত্যায় মদদ দান, লুটপাট, অর্থপাচার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। কারো কারো বিরুদ্ধে হত্যা চেষ্টা, বিস্ফোরক মামলায় সুস্পষ্ট অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে তাদের গ্রেফতারে গত সাত মাসেও কোন সাফল্য দেখাতে পারেনি পুলিশ।

পটিয়ায় বিগত দেড় দশক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতির ওপর চেপে বসা ফ্যাসিবাদি শাসনে আওয়ামী লীগের সাবেক হুইপ, সাবেক এমপি অনেকে রীতিমত দানবে পরিণত হয়। সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, দলীয়করণ এবং আত্মীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, সরকারি জমি, বন, নদী, খাল, পাহাড় দখল থেকে শুরু করে এমন কোন অপরাধ নেই যা তারা এবং তাদের সহযোগীরা করেনি। এলাকায় তাদের কথাই ছিল আইন। তাদের ইশারা ছাড়া নড়েনি গাছের পাতাও। তাদের বাহিনীর কাছে সাধারণ মানুষ ছিল জিম্মি। প্রশাসন ছিল তাদের হুকুমের গোলাম। পুলিশ ছিল দলীয় লাঠিয়ালের ভূমিকায়। তাদের চরম প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের ইশারায় বিরোধী দলের অনেক কর্মী শিকার হয়েছেন মিথ্যা ও সাজানো বা গায়েবি মামলায় আসামি হয়ে বছরের পর বছর কারাবরণ করেছেন। বাড়ি-ঘরছাড়া হয়েছেন অনেকে। পতিত স্বৈরাচারের সাবেক হুইপ সামশুল হক চৌধুরী, সাবেক এমপি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান দিদারুল আলম, সাবেক পৌর মেয়র আইয়ুব বাবুল চরম ঘৃণিত হিসাবে ব্যাপক কুখ্যাতি অর্জন করেছেন তারা।

বিতর্কিত সাবেক সংসদ সদস্য ও হুইপ সামশুল হক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা দিদারুল আলম, সাবেক পৌর মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা আইয়ুব বাবুল গত ৫ আগষ্ট ছাত্র জনতার গনঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে দেশ ত্যাগের পর তারাও আত্নগোপনে চলে যায়। গত সাড়ে চার মাসে তারা চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্হানে জায়গা বদল করে পালিয়ে আছেন।

তবে সাবেক হুইপ ও বির্তকিত সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী চট্টগ্রামে আত্নগোপনে রয়েছেন। কয়েক মাস বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলে বান্দরবান পৌরসভার সাবেক মেয়রের সাথে আত্নগোপনে রয়েছেন বলে সূত্রে জানা গেছে। অপর সাবেক সংসদ সদস্য মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী চট্টগ্রামেই আত্নগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে, পটিয়ার সাবেক দুই সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী ও মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী গত ৫ আগষ্টের পর থেকেই তাদের নিজস্ব ফেইসবুক পেইজও বন্ধ রেখেছে। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা দিদারুল আলমেরও ফেইসবুক পেইজ বন্ধ রাখা হয়েছে। সম্প্রতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী ছাড়া বাকী সবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়ে দিচ্ছেন নানা নেতিবাচক পোস্ট।

অন্যদিকে, গত সাত মাসে পটিয়ার কোন সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র, ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের শীর্ষ স্হানীয় নেতাদের গ্রেফতার করতে পারেনি পটিয়া থানা পুলিশ। এ পর্যন্ত হাতেগুনা যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ তারা আওয়ামী লীগের অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের তৃনমুল পর্যায়ের নেতাকর্মী। তারা দলের কোন সুযোগ সুবিধা তো দুরের কথা তারা কোন সময় সেই ক্ষমতার স্বাদ পাননি।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্হানীয় নেতাদের গ্রেফতার করতে না পারায় ইতোমধ্যে পটিয়া বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পুলিশে নিষ্ক্রিয়তা ও আওয়ামী লীগের সাথে তাদের যোগসাজশের অভিযোগ তোলেন।

পটিয়ার এমপি হয়ে মাদক ব্যবসা, দখলবাজি, সরকারী অর্থ লুটপাটসহ নানা অপকর্মের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যান সামশুল হক চৌধুরী ও তার ছেলে শারুন, তার ছোট ভাই নবাব, মহব্বত, তার ভাগিনা লোকমান, সিমন, তার কথিত পিএস এজাজ। তাদের কাছে পটিয়ার মানুষ ছিল রীতিমত জিম্মি। আওয়ামী লীগের লোকজন এক পর্যায়ে তার লুটপাট ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মাঠে নামে। দুদকে তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়। সামশু ছিল এলাকার ত্রাস। হাসিনার পতনের পর আড়ালে চলে গেছেন এই দুর্নীতিবাজ সহ আরো অনেকেই। পুলিশ খুঁজছে তাকে ও ছেলে, তার ভাই ভাগিনা এবং তার দোসরদের।

ক্ষমতার পালাবদলের পর সাবেক হুইপ সামশুল হক চৌধুরী ও তাঁর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের হদিস মিলছে না। আওয়ামী লীগ শাসনামলে ক্যাসিনো ব্যবসাসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ানো এই এমপির বিরুদ্ধে বর্তমান প্রশাসনব্যবস্থা প্রচেষ্টা চালালেও। স্থানীয়দের ধারণা, জেল-জরিমানার আতঙ্কে সামশুল হক চৌধুরী এলাকা থেকে পালিয়ে পুরো পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামেই আত্মগোপনে আছেন।

জাতীয় পার্টি, যুবদলের রাজনীতি মাড়িয়ে আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ডে সামশুল হক চৌধুরী ২০০৮ সাল হতে নৌকা প্রতীকে পরপর ভোটারবিহীন নির্বাচনে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ফ্যাসিস্ট হাসিনার একতরফা ডামি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি থাকায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। নির্বাচনে ভরাডুবি হয় তাঁর।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় সামশুল হক চৌধুরী, ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন, ভাই মুজিবুল হক চৌধুরী নবাব, ফজলুল হক চৌধুরী মহব্বত, ভাগিনা লোকমান, সিমন ও তার কথিত পিএস এজাজ ক্যাসিনো ব্যবসা, দখল-চাঁদাবাজি, গুম, খুন, মামলা-হামলায় অতিষ্ঠ ছিলেন এলাকার সাধারণ মানুষ।

এমনকি এমপি থাকা অবস্থায় ক্রীড়াঙ্গনের ক্লাবগুলোতে তিনি ক্যাসিনোসহ জুয়ার আসর বসাতেন। ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকারের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান সম্পর্কে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে। তখন তার এহেন বক্তব্যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন তৎকালীন সরকার ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সেসময় সারা দেশে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল তার ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে। বির্তকিত সেই ঘটনার পর তিনি বেশ কয়েকবার এলাকায় সাধারণ মানুষ কর্তৃক লাঞ্ছিত হন। তাঁর বিরুদ্ধে নিজ এলাকায় জুতা মিছিল হয়। বেশ কয়েকটি সভা-সমাবেশ থেকে ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর আলাদিনের চেরাগের মতো রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া সামশুল হক চৌধুরী এখন তার দোসররাসহ লাপাত্তা।

জানা যায়, সামশুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পুলিশ পরিদর্শক মাহমুদ সাইফুল আমিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক পোস্টের বক্তব্যেও হুইপের আয়ের একাংশের একটা চিত্র ফুটে উঠেছিল। সারাদেশে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় এই পুলিশ কর্মকর্তা ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছিলেন সামশুল হক চৌধুরী প্রতিদিন চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাব থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং বছরে মাঠ ভাড়া দিয়ে কোটি টাকা অবৈধ আয় করেন। জুয়ার আসর থেকে পাঁচ বছরে তাঁর আয়ের পরিমাণ ১৮০ কোটি টাকা।

এদিকে, ১৯৯৯-২০০০ সালের দিকে এক শিল্পপতির হাত ধরে চট্টগ্রাম আবাহনী লিমিটেডের মহাসচিব হন সামশুল হক চৌধুরী। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে লন্ডনে ফুটবল দল নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ ওঠে। ওই সময় সরকার ২২ জনের দল নেওয়ার অনুমতি দিলেও আরো ১৫ জন বেশি নিয়ে যান তিনি। এই অনিয়মের কারণে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন সামশুল হক। ২০০৭ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ লীগে অংশগ্রহণের আগে ফিফার গাইডলাইন অনুযায়ী নগরীর জিইসি মোড়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করা হয়। ওই অ্যাকাউন্টে তিনজনের নাম থাকলেও তৎকালীন সভাপতি দিদারুল আলমকে বাদ দিয়েই সামশুলসহ দুজন টাকা উত্তোলন করেছেন। বিষয়টি জানার পর দিদারুল ওই ব্যাংকে অভিযোগ দিলে অ্যাকাউন্ট স্থগিত হয়।

অপরদিকে, বির্তকিত সাবেক হুইপ সামশুল হকের বিরুদ্ধে আবারো দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। ২ অক্টোবর দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কমিশন সভা থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই সাবেক এমপির বিরুদ্ধে অর্থপাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুদকের গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্যও আমলে নেওয়া হয়েছে।

এর আগে, ২০২৩ সালের ৮ মে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন সাবেক হুইপ ও চট্টগ্রামের পটিয়ার বির্তকিত সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী। সেসময় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতার কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

দুদক সূত্রে জানা যায়, অব্যাহতিপত্রটি ওই দিনই গনঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ এবং সরকারের সংশ্নিষ্ট সকল বিভাগে পাঠানো হয়েছিল। ২০১৯ সালে বিভিন্ন পত্রিকায় করা সংবাদের ওপর ভিত্তি করে এবং দুদকে বিভিন্ন ব্যাক্তির করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে তৎকালীন দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন সাবেক হুইপ সামশুলসহ আরও বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেন। প্রায় চার বছর নামে মাত্র অনুসন্ধান করে বির্তকিত সাবেক হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর নামে হওয়া সংবাদ এবং অভিযোগের সত্যতার কোনো প্রমাণ এবং তার নামে-বেনামে কোনো অবৈধ সম্পদ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। অবশ্য অভিযুক্ত অন্য এমপিদের দুদক জিজ্ঞাসাবাদ করলেও সেসময় সাবেক হুইপ সামশুল হক চৌধুরীকে দুদক কখনও জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।

এর আগে সামশুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে অবৈধ আয়ের অভিযোগ তোলা পুলিশ পরিদর্শক সাইফ আমিনকে আদালত সাজা দেন। তার বিরুদ্ধে সামশু ‘মিথ্যা তথ্যথ ছড়ানোর মামলা করেন আদালতে।

অন্যদিকে, অবৈধ সম্পদ ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ অনুসন্ধানে পটিয়া আসনের বির্তকিত সাবেক সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরীকে ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছিল দুদক। ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এর পরপরই দুদক তফসিলভুক্ত অবৈধ সম্পদের অপরাধ খতিয়ে দেখতে ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানের কাজ শুরু করে। সংস্থাটির তৎকালীন পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের টিম অনুসন্ধানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

আরো জানা যায়, ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে সারা দেশে শুরু হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘শুদ্ধিথ অভিযান। পাশাপাশি ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী এবং বিদেশে অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা ও কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত এমন প্রায় ২০০ রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ীকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। তাদের মধ্যে অন্যতম সামশুল হক চৌধুরী। সংস্থাটির এমন উদ্যোগ সর্বমহলে বেশ সমাদৃত হলেও শেষ পর্যন্ত এসব উদ্যোগ অনেকটাই যেন মুখ থুবড়ে পড়েছিল। অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুরাহা হয়নি। এমনকি সাবেক হুইপ সামশুল হক চৌধুরীকে দুদক কোন রকম জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া মামলা থেকে দায়মুক্তি দেয়া হয়।

সেসময় অনুসন্ধানে নেমেই যেন গতি হারিয়ে ফেলছিলেন দুদক! অভিযুক্তের তালিকায় নাম আসা প্রায় ৯০ ভাগের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূলে শপথ নেওয়া সংস্থাটি। সামশুল হক চৌধুরীর মতো অপরাধীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলয়ে থেকে সেসময় দায়মুক্তি নিয়েছিলেন। তাকে ধরতে গেলে হাত পুড়ে যাবে এমন ভয় ছিল খোদ দুদকেরও।

চট্টগ্রাম-১২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক হুইপ সামশুল হক চৌধুরী ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দরে প্রাক্কলন তৈরি করে টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, মাদক চোরাকারবারিদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়া, তার এলাকার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিলের ওপর অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নানা দুর্নীতি, অনিয়ম, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থ পাচারসহ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক ১০ জন সংসদ সদস্যের (এমপি) দুর্নীতির অনুসন্ধান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহার করে শতকোটির টাকার মালিক হওয়া সামশুল হক চৌধুরীর ছোট দুই ভাই নবাব মহব্বত এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। এ নিয়ে পটিয়ার সাধারণ মানুষদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। সামশুর ছোট ভাই নবাব পেশায় ছিলেন দর্জি আরেক ছোট ভাই মহব্বত এলাকায় কৃষিকাজ করতেন। কৃষক হলেও ২০০৮ সালে বড়ভাই সামশুল হক চৌধুরী সংসদ সদস্য হওয়ার পর পাল্টে যায় তাদের ভাগ্য। দুই ভাই মিলে পটিয়ায় গড়ে তোলেন অপরাধের সাম্রাজ্য। ভাই টানা তিনবার সংসদ সদস্য ও হুইপ থাকাকালীন তাদের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকে। উপজেলায় গরু চোর চক্রের সঙ্গে সখ্য করে জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের নাইখাইন এলাকায় অসহায় মানুষের জায়গা দখল করে বিশাল ডেইরি ফার্ম গড়ে তোলেন তারা। এই ডেইরি ফার্মে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে গরু চোরেরা গরু চুরি করে এনে কম দামে বিক্রি করতেন বলে স্হানীয় সূত্রে জানা গেছে।

নবাব দর্জি থেকে বনে যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। গত ১৬ বছরে চট্টগ্রাম শহরে কিনে নেন কয়েকটি ফ্লাট, অনেক জমি ও ব্যবসায়িক স্পেস। সরকারি সব টেন্ডার ভাগিয়ে নিয়ে কমিশনে অন্যদের দিয়ে করিয়ে নেন কাজ। তদবির বাণিজ্য, থানা কন্ট্রোল, মাটি বহনকারী গাড়িপ্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা চাঁদা, বালু মহাল দখল, চাঁদাবাজি, জায়গা দখল, মাদক, অস্ত্রের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত তারা। তাদের কথার বাইরে গেলে মামলা থেকে রেহায় পেত না কেউ।এ ছাড়াও এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে শতাধিক জায়গা জোরপূর্বক নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার অভিযোগ আছে। উপজেলা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে মহব্বত শতাধিক দলিল তৈরি করে বলেও সূত্রে জানা যায়। তা ছাড়াও আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তারা।

গত ১৮ জুলাই ও ৪ আগষ্ট পটিয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ছাত্র জনতার মিছিলে হামলা, গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ সহ বেশ কয়েকটি দায়ের হওয়া মামলায় সামশুল হক চৌধুরীকে প্রধান আসামি। এসমব মামলায় তার গুনধর পুত্র শারুন, ছোট ভাই নবাব, মহব্বত, ভাগিনা লোকমান, কথিত পিএস এজাজ সহ আসামী করা হয়েছে। কিন্তু গত তিন মাসে তাদের কেউ গ্রেফতার হননি। এজাজকে চট্টগ্রাম থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছে।

আওয়ামী লীগের এ সাবেক এমপি ও দলটির উল্লেখযোগ্য সিনিয়র নেতাদের কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না এমন এক প্রশ্নের জবাবে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, জেলা পুলিশ সুপার স্যার থানার ওসিদের নির্দেশ দিয়েছেন গনঅভ্যুত্থান পূর্ব ও পরবর্তী মামলার আসামিদের গ্রেফতার করতে। ইতোমধ্যে আমরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার সাবেক সংসদ সদস্যদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনেছি। খুব শীগ্রই পটিয়াতেও এসব মামলার আসামিরা গ্রেফতার হবে। তাদের গ্রেফতার করতে আমাদের পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে।

- Advertisement -spot_img
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ

- Advertisement -spot_img

এই বিভাগের আরও

- Advertisement -spot_img